কাপিষ্টা সমবায় ও তার ইতিহাস
দেশ সদ্য স্বাধীন, বাংলার প্রত্যন্ত জেলা বাঁকুড়ার গ্রামাঞ্চল তখনও আর্থিকভাবে দুর্বল। চাষের মৌসুম সামনে, জমিতে জল ধরেছে —কিন্তু কৃষকদের হাতে নেই পর্যাপ্ত মূলধন। বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে অতি চড়া সুদে অর্থ ধার করতে হতো, যার ফলে কৃষকরা লাভ তো দূরের কথা, প্রায়ই জমি-জায়গা পর্যন্ত বন্ধক রাখতে বাধ্য হতেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দু বেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান কঠিন হতো।
ঠিক সেই সময় কাপিস্টা গ্রামের একদল দূরদর্শী যুবক তাদের সমাজের জন্য কিছু করার সংকল্প নেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু কিছু (দশ পাই) করে ধান সংগ্রহ করে একটি ছোট ফান্ড গঠনের। সেই ফান্ডের নাম দেওয়া হয় “তরুণ সমবায় সমিতি”।
সংগ্রহকৃত ধান সংরক্ষণ করা এবং সমিতির সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিনা করার মতো তখনও সমিতির নিজস্ব কোনো ঘর তৈরি হয়নি। সোবহান সাহেবের বাড়িতেই সংগ্রহকৃত ধান সংরক্ষণ করা হতো এবং সমিতির সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত।
গ্রামের যেসব যুবক চাকরিতে ছিলেন, ফিরে সমিতির খাতা-কলম সামলাতেন। আর যারা গ্রামে ছিলেন, তারা ঘরে ঘরে ঘুরে ধান সংগ্রহ করতেন। চাষের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকদের ধানি-ঋণ দেওয়া হতো এবং ধান উঠলে কৃষকেরা তা পরিশোধ করতেন। ধীরে–ধীরে মজুদের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তখনই প্রয়োজন বোঝা যায় সরকারিভাবে রেজিস্ট্রেশন করার। পরবর্তীতে সমিতির নাম রাখা হয়
“Kapista Large Sized Agricultural Credit Co-operative Society Ltd.”
এবং ১৯৫৭ সালে সরকারি নিবন্ধন সম্পন্ন হয় “Kapista SKUS Ltd.” নামে।
এরপর সমিতির কার্যক্রম বিস্তৃত হতে থাকে। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে চাষীদের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে। ধানের পাশাপাশি নগদ অর্থে ঋণ দেওয়া শুরু হয়। পরিষেবার মান উন্নত করতে বাইরে থেকে একজন প্রশিক্ষিত ব্যবস্থাপক নিয়োগ করা হয়।
ক্রমে আমানত ব্যবস্থা চালু হয়—যদিও তখন নগদের তুলনায় চাল-ভিত্তিক সঞ্চয়ই বেশি ছিল। একসময় দেখা যায় আমানত বিভাগের মোট সঞ্চিত অর্থমূল্য দাঁড়িয়েছে ১১২ টাকা ৫০ পয়সা। এই টাকাকে আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে গ্রামবাসীদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক হয়। মহিলাদের বোঝানো হয়—প্রতিদিন এক মুঠো চাল জমিয়ে আমানত রাখলে সংসারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে। একইসাথে তাদের উৎসাহিত করা হয় মুরগি পালনের মাধ্যমে নিজস্ব সঞ্চয় গড়ে তুলতে। এর ফল ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক।
সমিতির নিজস্ব প্রাথমিক অফিস ছিল বর্তমান রেশন ডিলারের জায়গায় তৈরি একটি ছোট মাটির ঘর। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে নতুন ভবনের ইট পড়ানো হয় এবং ১৯৬৪ সালে গড়ে ওঠে প্রশাসনিক ভবন ও গুদামঘর। ধীরে ধীরে জমি কেনা, সম্পত্তি বৃদ্ধি, এবং জনসাধারণের জন্য গনবণ্টন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সমিতি হয়ে ওঠে এলাকার নির্ভরতার কেন্দ্র। সুলভ মূল্যে চিনি, গম, মায়লা ও মারকিন কাপড় ইত্যাদি সরবরাহ করত সমিতি—যা সেই সময়ের মানুষের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেবিলাল কৃষিঋণ মকুব ঘোষণার সময় ব্যাংকগুলো সমবায় প্রতিষ্ঠানকে সুবিধার আওতায় আনতে চাইছিল না। তদানীন্তন পরিচালকরা রিজার্ভ ব্যাংকের আদেশ সংগ্রহ করে এনে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করেন—সমবায়ের কৃষকরাও যেন একই সুবিধা পান। এ ঘটনাটি সমিতির ইতিহাসে এক মাইলস্টোন হয়ে আছে।
আজকের Kapista SKUS Ltd. তৈরি হয়েছে সেই সময়ের, সময়ের চেয়ে এগিয়ে চলা অগ্রগামী তরুণদের চিন্তাশীল উদ্যোগ এবং সমবায়ের শক্তিকে মেনে নেওয়া গ্রামবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে। সমিতির জমির ওপরই আজ গড়ে উঠেছে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
গত সাত দশক ধরে বিভিন্ন কর্মকর্তা, পর্ষদ সদস্য ও কর্মচারীদের নিষ্ঠা–পরিশ্রমে এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সমিতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে অসংখ্য আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প। কিছু পরিকল্পনা অত্যন্ত সফল হয়েছে, আর কিছু হয়তো সফলতার মুখ পুরোপুরি দেখেনি—কিন্তু সমিতি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এক গৌরবময়, আস্থার ও উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে।
কাপিস্তা এস. কে. ইউ. এস. লিমিটেড শুধু একটি আর্থিক সমবায় প্রতিষ্ঠান নয়—এটি কাপিস্টা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের আশা, ঐক্য, সহযোগিতা ও উন্নয়নের প্রতীক। স্বাধীনতার পরবর্তী কঠিন সময়ে যে অল্প থেকে সমবায়ের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
আগামী দিনেও এই সমিতি একইভাবে স্বচ্ছতা, সহযোগিতা, আত্মনির্ভরতা এবং সম্মিলিত অগ্রগতির পথ ধরে এলাকার উন্নয়নে নিজেকে নিবেদিত রাখবে—এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
